হাল না ছাড়া নকশী পিঠা
রাত তখন প্রায় তিনটা।
আরিফ ছাদের এক কোণে বসে ফোনে কথা বলছে। অন্যপাশে মেহজাবিন।
“তুমি কবে কিছু একটা করবে?” — মেয়েটার কণ্ঠে অভিমান।
আরিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“চেষ্টা তো করছি।”
“চেষ্টা আর কতদিন? বাসা থেকে আমার বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।”
এই কথাটা আরিফ গত এক বছরে অসংখ্যবার শুনেছে। কিন্তু প্রতিবারই বুকের ভেতর কেমন যেন চাপা ভয় কাজ করত।
অনার্স শেষ হয়েছে প্রায় আট মাস। বন্ধুরা কেউ বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ চাকরি পেয়েছে, কেউ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আরিফের জীবন তখনও অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে।
শেষ পর্যন্ত মেহজাবিনের চাপ, পরিবারের বাস্তবতা আর নিজের অস্থিরতা মিলিয়ে সে একটি চাকরি নেয়।
চট্টগ্রামের একটি বড় Consumer Company-তে Sales Representative।
প্রথমদিন অফিসে গিয়ে তার মনে হয়েছিল, “জীবন বুঝি এখন ঠিক পথে যাচ্ছে।”
কিন্তু বাস্তবতা ছিল অন্যরকম।
রাত জেগে মেহজাবিনের সঙ্গে ফোনে কথা হতো। কখনও ঝগড়া, কখনও ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কখনও কান্না।
ফলে সকালে ঘুম ভাঙত দেরিতে।
প্রতিদিন দেরি করে অফিসে পৌঁছানো, Target miss করা, সিনিয়রদের বকা—সব মিলিয়ে তিন মাসের মাথায় পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে গেল।
একদিন Manager সরাসরি বললেন,
“তুমি চাকরিটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছ না।”
আরিফ চুপ করে ছিল।
কারণ ভেতরে ভেতরে সে নিজেও বুঝে গিয়েছিল—এই চাকরি তার জন্য না।
কয়েকদিন পর সে চাকরি ছেড়ে দিল।
বাসায় খবরটা জানাতেই ঝড় বয়ে গেল।
বাবা ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন,
“জীবনে একটা জিনিসও ঠিকমতো করতে পারলি না!”
কিন্তু তখন আরিফের মাথায় নতুন স্বপ্ন।
ব্যবসা করবে।
বন্ধুরা পরামর্শ দিল—
“মাম্মা, বাইকের ব্যবসা কর। এখন বাইকের মার্কেট Booming!!”
অনেক বুঝিয়ে বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছোট একটা বাইকের শোরুম দিল আরিফ।
শুরুর কয়েকদিন নিজেকে খুব সফল মনে হচ্ছিল।
Facebook-এ Showroom-এর ছবি Upload, Stylish পোশাক পরে Live করা, বন্ধুদের আড্ডা—সবকিছু যেন সিনেমার মতো।
কিন্তু ব্যবসা শুধু শোরুম সাজানো না।
কোন বাইকের ডিমান্ড কেমন, কাকে বাকিতে দেয়া যাবে, Spare parts management, Profit margin—এসব সম্পর্কে তার কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল না।
কিছুদিন পর লোকসান শুরু।
একজন কাস্টমার টাকা না দিয়ে উধাও।
ভুল মডেলের বাইক এনে পড়ে থাকা।
মেকানিকের প্রতারণা।
ছয় মাসের মাথায় ব্যবসা প্রায় বন্ধ।
এক রাতে মেহজাবিন ফোনে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তুমি আসলে কি করতে চাও জীবনে?”
আরিফের কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
তবুও সে থামেনি।
এইবার সে ভাবল—“আমি Fashion ভালোবাসি। এটা নিয়েই কিছু করি।”
বাবার বাকি টাকাগুলো নিয়ে পুরুষদের ফ্যাশন শোরুম দিল।
দামি শার্ট, ঘড়ি, পারফিউম, জুতা — সবকিছু দারুন ভাবে সাজানো।
শুরুর দিকে বিক্রি ভালোই হচ্ছিল।
কিন্তু আবারও একই সমস্যা।
Inventory management বোঝে না।
যা Trend না, সেটাই Bulk-এ কিনে ফেলে।
বন্ধুদের বাকিতে পণ্য দিয়ে টাকা ফেরত পায় না।
ধীরে ধীরে লোকসান শুরু হলো।
একদিন দোকানের shutter নামানোর সময় সে বুঝল—সব শেষ।
বাবার দেয়া টাকার শেষ অংশটুকুও হারিয়ে গেছে।
সেদিন বাসায় ফিরে বাবা শুধু একটি কথাই বলেছিলেন—
“তোর ওপর ভরসা করা ভুল ছিল।”
কথাটা আরিফকে ভিতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল।
এদিকে মেহজাবিনের বাসা থেকে বিয়ের চাপ আরও বাড়ছে।
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলত,
“তুমি কিছু একটা করো প্লিজ… না হলে ওরা আমাকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দেবে।”
এই ভয়টাই আরিফকে আবারও দৌড় করাল।
এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হলো একজন Restaurant ব্যবসায়ীর সঙ্গে।
লোকটি বলল,
“তুমি Investment দাও, আমি সব Manage করব।”
আরিফ শেষ চেষ্টা হিসেবে ধার করে টাকা জোগাড় করল।
ছোট একটি রেস্টুরেন্ট শুরু হলো পার্টনারশীপে।
শুরুর দিকে সবকিছু ভালোই চলছিল। Restaurant-এ crowd বাড়ছিল। Facebook review ভালো আসছিল।
আরিফ আবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
কিন্তু নয় মাস পর একদিন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল।
সে জানতে পারল, ব্যবসার সব Documents, Trade license, Bank papers—সব পার্টনারের নামে।
আরিফ প্রতিবাদ করতেই লোকটা ঠাণ্ডা গলায় বলল,
“তুমি চাইলে বের হয়ে যেতে পারো।”
সেদিন Restaurant-এর সামনে দাঁড়িয়ে আরিফ বুঝতে পারছিল না সে হাসবে না কাঁদবে।
তার জীবনের তিনটি ব্যবসাই শেষ।
টাকা নেই।
সম্মান নেই।
ভবিষ্যৎ নেই।
সেদিন রাতে মেহজাবিনের সঙ্গে ভয়ংকর ঝগড়া হলো।
মেয়েটা কান্না করতে করতে বলল,
“আমি আর পারছি না আরিফ…”
কল কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ ফোনের Screen-এর দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
তারপর নিঃশব্দে কেঁদেছিল।
কিছুদিন পর সে শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেল।
গ্রামের বাড়িটা নদীর পাশেই। চারদিকে ধানক্ষেত, কাঁচা রাস্তা আর শান্ত পরিবেশ।
প্রথম কয়েকদিন সে কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না।
বিকেলে নদীর পাড়ে বসে থাকত। রাতে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবত—“জীবনটা কি সত্যিই শেষ?”
একদিন গ্রামের একটি মেলায় গিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল, কয়েকজন মহিলা বড় বড় হাঁড়িতে “নকশী পিঠা” বানাচ্ছেন।
তাদের গ্রামের বহু পুরোনো একটি খাবার।
মাটির চুলায় ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠা, নারিকেলের গন্ধ আর গুড়ের মিষ্টি সুবাসে পুরো জায়গাটা ভরে ছিল।
আরিফ ছোটবেলায় এই পিঠা খুব পছন্দ করত।
কয়েক সপ্তাহ পর তার ফুফাতো বোনের বিয়ে ছিল শহরে।
গ্রাম থেকে সবাই বিভিন্ন জিনিস নিয়ে যাচ্ছিল। আরিফের মা বললেন,
“কিছু নকশী পিঠা নিয়ে যা। শহরের মানুষ পছন্দ করবে।”
অনিচ্ছা নিয়েই কয়েক ডজন পিঠা নিয়ে গেল সে।
বিয়ের রাতে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
যারা পিঠা খাচ্ছিল, প্রায় সবাই একই কথা বলছিল—
“এত মজার জিনিস!”
“কোথা থেকে এনেছ?”
“এটা কি Order করা যায়?”
“শহরে পাওয়া গেলে মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে কিনত!”
আরিফ অবাক হয়ে মানুষের Reaction দেখছিল।
ঠিক তখন তার ফুফাতো বোন তানহা হেসে বলল,
“তুই এত Business করলি, অথচ আসল জিনিসটা চিনলি না।”
আরিফ চুপ।
তানহা আবার বলল,
“মানুষ এখন Authentic খাবার খোঁজে। গ্রামের Taste খোঁজে। তুই এটা নিয়ে কাজ কর।”
“পিঠা বিক্রি করব?” — আরিফ অবিশ্বাসের সঙ্গে বলল।
“কেন? Coffee বিক্রি করা Smart, আর নিজের গ্রামের খাবার বিক্রি করা লজ্জার?”
কথাটা আরিফের মাথায় গেঁথে গেল।
সেদিন রাতেই সে নতুনভাবে চিন্তা শুরু করল।
এইবার প্রথমবারের মতো সে বুঝল—ব্যবসা মানে শুধু Trend follow করা না।
নিজের বাস্তবতা, নিজের Roots, নিজের Culture—এসবও Business হতে পারে।
গ্রামে ফিরে গিয়ে সে Research শুরু করল।
কিভাবে Hygienic packaging করা যায়।
কিভাবে Frozen version বানানো যায়।
কিভাবে Social media-তে Storytelling করা যায়।
এইবার সে তাড়াহুড়া করেনি।
আগের ভুলগুলো থেকে শিখেছিল।
প্রথমে ছোট করে শুরু করল।
Facebook page খুলল।
গ্রামের মহিলাদের নিয়ে Team বানাল।
পিঠা বানানোর পুরো প্রসেস Cinematic video-তে Upload করল।
ভিডিওতে দেখা যেত—
ভোরবেলার কুয়াশা, মাটির চুলা, গুড় গলানোর দৃশ্য, ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠা।
মানুষ পাগলের মতো Share করতে শুরু করল।
প্রথম সপ্তাহেই বাজিমাত।
দুই মাস পর শহরের Food blogger-রা তার Page নিয়ে ভিডিও বানালো।
ছয় মাসের মাথায় তার Brand শহরের পরিচিত নাম হয়ে গেল।
আর সবচেয়ে সুন্দর দিনটা এলো এক বর্ষার সন্ধ্যায়।
নামাজ শেষে বৃস্টিতে ভিজতে ভিজতে আরিফ তার Shop-এর সামনে এসে পৌছল। Glass-এর দরজায় বড় করে লেখা— “নকশী পিঠা”
ওপাশ থেকে মেহজাবিন দরজা খুলে আরিফের সামনে এসে দাঁড়াল।
আরিফের কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছিল, তখন মুচকি হেসে মেহজাবিন বলল
“এইবার মনে হচ্ছে তুমি সত্যিই তোমার আসল জিনিসটা খুঁজে পেয়েছ।”
আরিফ কিছু মৃদু হেসে হাত বাড়ালো।
মেহজাবিনও তার হাত বাড়িয়ে দিলে দোকানের ভেতরে কাজ করতে থাকা গ্রামের মহিলাদের করতালি বেজে ওঠে।
আরিফ তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটাই পেল - জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলো কখনও কখনও মানুষকে ঠিক জায়গাতেই নিয়ে আসে। শুধু হাল না ছেড়ে, শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে হয়।
হারিয়ে যাওয়া নাঈমের গল্পটি পড়তে ক্লিক করুন
কচুরিপানা গল্পটি পড়তে ক্লিক করুন
=================
© মো: রিয়াদ কাইসার
