নকশী গল্প
বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ।
ছোট্ট ভাড়া বাসার টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ যেন আরও বেশি করে অভাবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল রিমিকে।
চুলার পাশে দাঁড়িয়ে সে খিচুড়ি নেড়ে দেখল। পাশের কড়াইয়ে ডিম ভাজি। রান্না শেষ হলেও তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
কারণ সে জানত—মসলার অভাবে খাবারের স্বাদ ঠিক আসবে না।
রিমির খুব ইচ্ছে করছিল আজ একটু ভালো কিছু রান্না করবে। শাহেদের অফিসে অনেক চাপ যাচ্ছে। মানুষটা প্রতিদিন ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফেরে। অন্তত খাবারটা যেন ভালো হয়।
কিন্তু বাজারের হিসাব মিলাতে গিয়ে আবারও সে হার মেনে গেছে।
এই মাসে ঘরভাড়া দেওয়ার পর শাহেদের বেতনের প্রায় সবটাই শেষ হয়ে গেছে।
গ্যাস বিল।
বিদ্যুৎ বিল।
বাচ্চার দুধ।
ঔষধ।
বাজার।
মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা শেষ হয়ে যায় প্রায়ই।
রিমি মাঝে মাঝে খুব অপরাধবোধে ভুগত।
“আমি যদি সংসারে একটু সাহায্য করতে পারতাম…”
কিন্তু কিভাবে?
তার পড়াশোনা খুব বেশি না। বাইরে অল্প বেতনে চাকরি করতে গেলেও ছোট ছেলে আয়ানকে দেখার কেউ নেই। শাহেদের অফিস সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।
কখনও কখনও রিমির মনে হতো, জীবনটা যেন আটকে গেছে।
একই রুটিন।
একই টানাপোড়েন।
একই হিসাব।
সেদিন রাতে শাহেদ বাসায় ফিরল ভিজে জামাকাপড়ে। ক্লান্ত মুখে খিচুড়ি খেতে খেতে হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“এ যেন বৃষ্টিরাতে জাফলংয়ের কোন কটেজে বসে খিচুড়ি খাওয়া, শুধু পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে না।”
রিমি জোর করে হাসল।
খেতে বসে শাহেদ বুঝতে পারল কিছু একটা হয়েছে।
“কি ভাবছ?”
রিমি ধীরে বলল,
“তোমাকে কিছুই দিতে পারি না।”
শাহেদ হেসে ফেলল।
“তুমি পাশে আছ, এটাই অনেক।”
কিন্তু রিমির মন ভরল না।
ঠিক তখনই ফোন এল।
রিমির ছোট বোন মিতুর।
ওপাশ থেকে খুশির কণ্ঠ—
“আপা… আমি মা হতে যাচ্ছি!”
রিমি আনন্দে কেঁদে ফেলল।
কিন্তু ফোন কেটে যাওয়ার পরই নতুন দুশ্চিন্তা শুরু হলো।
“বাচ্চার জন্য কি উপহার দেব?”
আগে হলে হয়তো সুন্দর জামা কিনত, খেলনা কিনত। কিন্তু এখন সংসারের অবস্থায় সেটা সম্ভব না।
রাতে ঘুমানোর আগে রিমি বিষয়টা শাহেদকে বলল।
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“তুমি তো ছোটবেলায় অনেক সুন্দর সেলাই করতে।”
রিমি অবাক হয়ে তাকাল।
“হ্যাঁ… নানুর কাছে শিখেছিলাম।”
“তাহলে কয়েকটা ছোট নকশী কাঁথা বানিয়ে দাও না? দোকানের জিনিসের চেয়ে অনেক স্পেশাল হবে।”
কথাটা রিমির মনে দাগ কাটল।
পরদিন পুরোনো কাপড়ের বাক্স বের করল সে।
মায়ের দেওয়া পুরোনো শাড়ি।
নিজের বিয়ের ওড়না।
একটি নরম সাদা কাপড়।
সব বের করে সে মেঝেতে বসে গেল।
অনেকদিন পর হাতে সুঁই-সুতা তুলে নিল।
প্রথম সেলাইটা দিতে গিয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতি হলো।
মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর নিজের একটা হারিয়ে যাওয়া অংশকে আবার খুঁজে পেয়েছে।
ধীরে ধীরে কাঁথাটায় নকশা ফুটে উঠতে লাগল।
চাঁদ।
পাখি।
গ্রামের গাছ।
ছোট ফুল। এক গর্ভধারিনীর মা হওয়ার গল্প।
রাতে আয়ান ঘুমিয়ে গেলে সে সেলাই করত। জানালার পাশে বসে হলুদ আলোয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করত।
শাহেদ মাঝে মাঝে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখত।
তার মনে হতো, এই সাধারণ কাপড়ের মধ্যে রিমি যেন নিজের মনের গল্প সেলাই করছে।
সপ্তাহ খানেক পর কাঁথাটা শেষ হলো।
মিতুর বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর যা ঘটল, সেটা কেউ কল্পনা করেনি।
সবাই কাঁথাটা ঘিরে দাঁড়িয়ে গেল।
“এটা হাতে বানানো?”
“এত সুন্দর!”
“কোথা থেকে করিয়েছ?”
“এটা তো দোকানের জিনিসের চেয়ে অনেক সুন্দর!”
মিতু তো কাঁথাটা বুকে জড়িয়ে কেঁদেই ফেলল।
“আপা, এটা আমি কখনও কাউকে দেব না।”
সেদিন বাসায় উপস্থিত মিতুর এক বান্ধবী রিমিকে আলাদা ডেকে বলল,
“আপু, আপনি কি অর্ডার নেন?”
রিমি হেসে বলল,
“না না, এটা শুধু শখে বানানো।”
কিন্তু মেয়েটা সিরিয়াস ছিল।
“আমি আমার Baby-এর জন্য এমন একটা চাই।”
বাসায় ফেরার সময় শাহেদ চুপচাপ ছিল।
হঠাৎ সে বলল,
“তুমি জানো, সবাই আজ তোমার কাঁথা নিয়েই কথা বলছিল?”
রিমি হেসে বলল,
“ওরা শুধু ভদ্রতা করেছে।”
“না। আমি মানুষের চোখ দেখেছি।”
সেদিন রাতে শাহেদ প্রথমবারের মতো নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।
পরের সপ্তাহে সে একটি ফেইসবুক পেইজ খুলে দিল—
“নকশী গল্প”
রিমি ভয় পেয়ে গেল।
“মানুষ কিনবে নাকি এসব?”
শাহেদ বলল,
“মানুষ শুধু কাপড় কিনবে না। তোমার হাতের গল্প কিনবে।”
তারপর শুরু হলো নতুন যাত্রা।
শাহেদ অফিস থেকে ফিরে ভিডিও করত।
রিমি সেলাই করত।
পুরোনো শাড়ির কাপড়ে নকশা ফুটে উঠত ধীরে ধীরে।
তারা অনেক দামী বিজ্ঞাপন ধরনের কিছু করল না।
বরং ভিডিওতে দেখাত—
একজন মা কিভাবে সন্তানের জন্য ভালোবাসা দিয়ে কাঁথা বানায়।
সকালের রোদে কাপড় শুকানো।
সুতো গুছিয়ে রাখা।
সেলাইয়ের Close shot।
মাঝে মাঝে আয়ানের ছোট্ট হাসি।
ভিডিওগুলোতে অদ্ভুত একটা শান্তি ছিল।
একদিন রিমি “অল্প পুঁজির ব্যবসা” নামের এক ফেইসবুক গ্রুপে একটি পোস্ট করল।
হঠাৎ পোস্টটি ছড়িয়ে গেল।
একজন জনপ্রিয় Influencer তাদের Page share করলেন।
তারপর ইনবক্স ভর্তি হতে শুরু করল।
“আমার baby-এর জন্য চাই।”
“বিদেশে পাঠানো যাবে?”
“Wedding gift হিসেবে বানাবেন?”
রিমি বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
ছোট্ট একটি রুম ধীরে ধীরে ওয়ার্কশপ হয়ে উঠল।
পাশের বাসার দুই আপা কাজ শিখতে এলেন।
তারপর আরও কয়েকজন।
প্রতিটি কাঁথার সঙ্গে একটি ছোট কার্ড দেওয়া হতো—
“এই কাঁথাটি হাতে সেলাই করেছেন…..তার নাম লিখে”
মানুষ শুধু পণ্য না, অনুভূতি পাচ্ছিল।
একদিন রাতে শাহেদ অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ বসে রইল।
রিমি জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে?”
শাহেদ ধীরে বলল,
“আজ বস বলেছে প্রমোশন পেতে হলে আরও সময় দিতে হবে অফিসে।”
“তাহলে তো ভালো।”
শাহেদ মৃদু হাসল।
“কিন্তু আমি বুঝতে পারছি… আমার মন এখন এখানে।”
রিমি অবাক হয়ে তাকাল।
শাহেদ চারদিকে ছড়িয়ে থাকা রঙিন কাপড়, সুতো আর শেষ না হওয়া কাঁথাগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমরা অন্য কারও স্বপ্ন বানাতে বানাতে নিজের স্বপ্নটা ভুলে গেছি।”
মাস খানেক পর, অনেক হিসাব-নিকাশ করে, অনেক ভয় নিয়ে, শাহেদ চাকরি ছেড়ে দিল।
পরিবারের অনেকে বলল তারা পাগল হয়ে গেছে।
“নকশী কাঁথা দিয়ে সংসার চলবে?”
কিন্তু তারা থামেনি।
এইবার তারা আরও প্রফেশনাল ভাবে কাজ শুরু করল।
গ্রামের মহিলাদের যুক্ত করল।
পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নকশা সংগ্রহ করল।
প্রতিটি ডিজাইন এর পেছনের গল্প লিখল।
তাদের Brand ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল।
এক বছর পর তারা ছোট একটি শোরুম নিল।
নকশী কাঁথা, নকশী চাদর সহ এখন অনেক কিছুই তৈরি করে তারা।
একটি ইকমার্স ওয়েবসাইট করল, শাহেদ বিপণন বিক্রয় এই সব দেখাশোনা করে।
একরাতে বৃষ্টি পড়ছিল টুপটাপ।
ছোট্ট ভাড়া বাসার টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ।
চুলার পাশে দাঁড়িয়ে রিমি খিচুড়ি নেড়ে দেখল। পাশের হাঁড়িতে গরুর মাংস ভুনা। রান্না ভাল হলেও তার মনটা ভারি হয়ে এল।
তার মনে পড়ছিল সেই রাতগুলোর কথা—
যখন মসলার অভাবে রান্নার স্বাদ হতো না।
যখন উপহার কেনার টাকাও ছিল না।
যখন সে নিজেকে অসহায় ভাবত।
আজ সেই অসহায়ত্বই তার সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক তখন আয়ান দৌড়ে এসে বলল,
“মা মা, দেখ বাবা আমার জন্য সুন্দর সাইকেল নিয়ে এসেছে!”
ছেলেকে জড়িয়ে রিমি জানালার বাইরে তাকাল।
বৃষ্টি পড়ছে।
কিন্তু আজকের বৃষ্টির শব্দ আর কষ্টের মতো লাগছে না।
বরং মনে হচ্ছে—
জীবনের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো হয়তো খুব সাধারণ অভাব থেকেই শুরু হয়।
=================
© মো: রিয়াদ কাইসার
- হারিয়ে যাওয়া নাঈম
- কচুরিপানা
- হাল না ছাড়া নকশী পিঠা
- ৫-৫০ হাজার টাকায় ১০০টি ব্যবসার আইডিয়া
- শহরে নারীদের জন্য ঘরে বসে ২০টি লাভজনক ব্যবসার আইডিয়া
- গ্রামে নারীদের অল্প পুঁজিতে ২০টি লাভজনক ব্যবসা আইডিয়া
- ৫০০০০ টাকায় নারীদের ৫০টি আধুনিক ব্যবসার আইডিয়া: সফল হওয়ার গাইড
- নতুন ব্যবসায়ীদের যে ভুলগুলো বেশি হয়: সফল হবার পূর্ণাঙ্গ গাইড
- চাকরি খোঁজার উপায়: দ্রুত কাজ পাওয়ার বাস্তব গাইড
- চাকরির আবেদন করার সঠিক পদ্ধতি: দ্রুত চাকরি পাওয়ার গাইড
- চাকরির সিভি কিভাবে লিখবেন: সহজ গাইড ও টিপস
- ইন্টারভিউতে সফল হওয়ার কৌশল: HR Interview Questions ও সেরা টিপস
- পছন্দের পেশা বাছাই: সঠিক সিদ্ধান্তের সহজ গাইড
- স্বাস্থ্য পেশায় ক্যারিয়ার গড়বেন? চাহিদা ও গাইড
- শখের ফটোগ্রাফি থেকে পেশাদার ক্যারিয়ার গড়ার পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
- খাবার ও রন্ধন শিল্পের বিভিন্ন পেশা ও আয় করার উপায়
- ফ্রিল্যান্সিং কি? বাংলাদেশে সহজে শুরু করার গাইড
- নতুনদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং গাইড: আয় শুরু করুন আজই
- কোন ফ্রিল্যান্সিং কাজ শিখবেন? আয় কত - শুরু করার গাইড
- নতুন ফ্রিল্যান্সারদের সাধারণ ভুল ও তা এড়িয়ে সফল হওয়ার উপায়
- নতুন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য টপ ২০টি মার্কেটপ্লেস গাইড
চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে দেখুন চাকরি চাই
শখের পেশা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে দেখুন শখের পেশা
ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে জানতে দেখুন ফ্রিল্যান্সিং
============================================
