হারিয়ে যাওয়া নাঈম

শীতের শেষ দিকের সময়। শহরের ব্যস্ততা, কাজের চাপ আর প্রতিদিনের একই রুটিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল নাঈম। সে চট্টগ্রামের একজন সাধারণ তরুণ গ্রাফিক ডিজাইনার। ফ্রিল্যান্সিং করে মোটামুটি আয় হলেও তার মনে সবসময় একটা আফসোস কাজ করত—“নিজের কিছু করা দরকার।”

একদিন হঠাৎ তার বন্ধু রাফি বলল,
“চল সাজেক ঘুরে আসি। মাথাটা ফ্রেশ হবে।”

হারিয়ে যাওয়া নাঈম

কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দুজন রওনা দিল পাহাড়ের পথে। বাসের জানালা দিয়ে কুয়াশা ঢাকা রাস্তা দেখতে দেখতে নাঈমের মনে হচ্ছিল, শহরের বাইরে পৃথিবীটা যেন একদম আলাদা।

সাজেকে পৌঁছানোর পর তারা একটি ছোট কাঠের কটেজে উঠল। চারদিকে মেঘ, পাহাড় আর ঠাণ্ডা বাতাস। রাত নামার পর পুরো জায়গাটা আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। কটেজের মালিক সাবধান করে বললেন,
“রাতে বেশি দূরে যাবেন না। পাহাড়ে কুয়াশা নামলে পথ চিনতে পারবেন না।”

কিন্তু রাফি আর নাঈমের মধ্যে রোমাঞ্চের নেশা ছিল। তারা রাতে পাহাড়ের এক পাশ দিয়ে হাঁটতে বের হলো। কিছুদূর যেতেই ঘন কুয়াশা নেমে এল। মোবাইল টর্চের আলোও ঠিকমতো কাজ করছিল না।

হঠাৎ দূরে একটি ক্ষীণ আলো দেখা গেল।

দুজন সেই আলোর দিকে এগিয়ে গেল। কাছে গিয়ে দেখে একটি ছোট বাঁশের ঘর। ভেতরে একজন বৃদ্ধ বসে আগুন পোহাচ্ছেন। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।

বৃদ্ধ তাদের ভেতরে ডাকলেন।
“পথ হারিয়েছ?”

নাঈম মাথা নেড়ে বলল, “জি।”

বৃদ্ধ হেসে চা বানাতে লাগলেন। কথা বলতে বলতে জানা গেল, তার নাম লালথাংগা। তিনি স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ। ঘরের এক কোণে বিভিন্ন রঙের হাতে তৈরি বাঁশের ল্যাম্প, ঝুড়ি আর সাজসজ্জার জিনিস রাখা ছিল।

নাঈম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো কি আপনি বানান?”

“হ্যাঁ,” বৃদ্ধ বললেন, “কিন্তু এখন আর আগের মতো বিক্রি হয় না।”

নাঈম একটি ল্যাম্প হাতে নিয়ে অবাক হয়ে গেল। এত সুন্দর হ্যান্ডমেড কাজ সে আগে খুব কম দেখেছে। ল্যাম্পের ভেতরে ছোট ছোট নকশা কাটা, আলো জ্বালালে পুরো ঘরে পাহাড়ের ছায়া পড়ে।

সে জিজ্ঞেস করল,
“এগুলো অনলাইনে বিক্রি করেন না কেন?”

বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“আমরা এসব বুঝি না বাবা। শহরের লোকেরা মাঝে মাঝে আসে, কিনে নিয়ে যায়।”

এই কথাটা নাঈমের মাথায় যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।

সে রাতভর ঘুমাতে পারল না।

তার মনে হতে লাগল—বাংলাদেশে তো এখন মানুষ ঘর সাজানোর জন্য কত কিছু কিনছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় হ্যান্ডমেড, ন্যাচারাল আর এস্থেটিক জিনিসের কত চাহিদা। অথচ পাহাড়ের এত সুন্দর শিল্প কেউ ঠিকভাবে তুলে ধরছে না।

পরদিন সকালে সে বৃদ্ধের কাজগুলো আবার মন দিয়ে দেখল। প্রতিটি জিনিস ইউনিক। প্রতিটির পেছনে গল্প আছে। পাহাড়ি সংস্কৃতির ছাপ আছে।

ফেরার পথে নাঈমের মাথায় শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছিল—
“এই পণ্যগুলো যদি সুন্দরভাবে ব্র্যান্ডিং করে অনলাইনে বিক্রি করা যায়?”

চট্টগ্রামে ফিরে এসে সে আবার আগের জীবনে ব্যস্ত হয়ে গেল। ক্লায়েন্টের কাজ, ডেডলাইন, রাত জেগে ডিজাইন—সব আগের মতোই চলছিল। কিন্তু সাজেকের সেই বাঁশের ল্যাম্পগুলো তার মাথা থেকে বের হচ্ছিল না।

কয়েক সপ্তাহ পর আরেকটি ঘটনা ঘটল।

একদিন রাতে সে একটি ক্যাফেতে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল। হঠাৎ পাশের টেবিলে বসা কয়েকজন তরুণ-তরুণীর কথা কানে এলো।

“এই ধরনের Rustic home decor এখন খুব ট্রেন্ডিং।”

“বিদেশে হলে এগুলো অনেক দামে বিক্রি হতো।”

নাঈম কৌতূহলী হয়ে তাকাল। তাদের টেবিলে কয়েকটি হ্যান্ডমেড কাঠের ডেকোরেশন রাখা ছিল। সে সাহস করে কথা বলতে এগিয়ে গেল।

আলাপের পর জানা গেল, তারা একটি ছোট অনলাইন পেজ চালায় যেখানে বিভিন্ন লোকাল হ্যান্ডমেড পণ্য বিক্রি হয়।

তাদের মধ্যে একজন মেয়ে, মেহরীন, বলল,
“সমস্যা হলো ইউনিক পণ্য পাওয়া যায় না। সবাই একই জিনিস বিক্রি করে।”

নাঈম সঙ্গে সঙ্গে ফোন বের করে সাজেকের সেই বাঁশের ল্যাম্পের ছবি দেখাল।

সবাই অবাক।

“ওয়াও! এগুলো বাংলাদেশে বানানো?”
“অসাধারণ!”
“এগুলো বাজারে আনলে মানুষ পাগল হয়ে কিনবে!”

সেই মুহূর্তে নাঈম বুঝল, তার আইডিয়াটা শুধু কল্পনা নয়—এটার বাস্তব বাজারও আছে।

সেদিন বাসায় ফিরে সে পুরো রাত পরিকল্পনা করল।

প্রথমে সে নিজের সঞ্চয়ের টাকা হিসাব করল। খুব বেশি নয়। কিন্তু শুরু করার জন্য যথেষ্ট।

সে পরিকল্পনা করল—

  • পাহাড়ি কারিগরদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করবে
  • প্রতিটি পণ্যের পেছনের গল্প তুলে ধরবে
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও কনটেন্ট বানাবে
  • “হ্যান্ডমেড ইন দ্য হিলস” টাইপ ব্র্যান্ডিং করবে
  • প্রিমিয়াম ফটোগ্রাফি ব্যবহার করবে

দুই সপ্তাহ পর সে আবার সাজেকে গেল।

এইবার পর্যটক হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা হিসেবে।

লালথাংগার সঙ্গে দেখা করে সে পুরো পরিকল্পনা খুলে বলল। বৃদ্ধ প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

“আমাদের জিনিস মানুষ সত্যি কিনবে?”

নাঈম হাসল।
“মানুষ শুধু জিনিস কিনবে না। আপনার গল্পও কিনবে।”

ধীরে ধীরে আরও কয়েকজন স্থানীয় কারিগর যুক্ত হলো। কেউ বাঁশের ল্যাম্প বানায়, কেউ কাঠের ওয়াল আর্ট, কেউ হাতে বোনা ঝুড়ি।

নাঈম তাদের কাজের ভিডিও করতে লাগল। পাহাড়ি পরিবেশে কাজ করার দৃশ্য, আগুনের পাশে বসে বাঁশ কাটার শব্দ, হাতে রঙ করার মুহূর্ত—সবকিছু সে Cinematic style-এ ধারণ করল।

তারপর সে একটি ফেসবুক পেজ খুলল—“HillCraft Stories।”

প্রথম ভিডিও পোস্ট করার পর খুব বেশি রেসপন্স আসেনি। কিন্তু নাঈম থামেনি। সে প্রতিদিন নতুন কনটেন্ট দিতে লাগল।

একদিন হঠাৎ একটি ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেল।

ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল, লালথাংগা রাতের অন্ধকারে একটি বাঁশের ল্যাম্পে শেষবারের মতো হাত বুলিয়ে বলছেন,
“এই আলো পাহাড়ের গল্প বলে।”

মাত্র তিন দিনে পাঁচ শতাধিক অর্ডার চলে এলো।

নাঈম হতবাক।

ছোট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সে প্যাকেজিং শুরু করল। প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে ছোট একটি কার্ড দেওয়া হতো যেখানে কারিগরের নাম আর গল্প লেখা থাকত।

মানুষ শুধু ডেকোরেশন কিনছিল না—একটা অনুভূতি কিনছিল।

ছয় মাসের মধ্যে তার ব্যবসা এত বড় হয়ে গেল যে তাকে আরও লোক নিয়োগ দিতে হলো। কয়েকজন ডিজাইনার, ডিজিটাল মার্কেটার, কাস্টমার সাপোর্ট, ডেলিভারি ম্যান—ধীরে ধীরে একটি পূর্ণ টিম তৈরি হলো।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পাহাড়ি কারিগরদের জীবনও বদলে যেতে শুরু করল।

যারা আগে খুব কম দামে কাজ বিক্রি করত, তারা এখন সম্মানজনক আয় করছে।

একদিন নাঈম আবার সাজেকে গেল।

সেই একই কুয়াশা, একই পাহাড়, একই ঠাণ্ডা বাতাস।

লালথাংগা এবার তাকে দেখে হাসলেন।
“তুমি সেদিন পথ হারিয়ে এখানে এসেছিলে। এখন দেখো, ‍তুমিই কত মানুষের পথ খুলে দিয়েছ।”

নাঈম চুপচাপ পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় আইডিয়াগুলো হয়তো অফিসের টেবিলে বসে আসে না। কখনও কখনও সেগুলো লুকিয়ে থাকে অজানা পথে, রোমাঞ্চের ভেতরে, কিংবা কোনো সাধারণ মানুষের গল্পে।

আর সেই আইডিয়াকে কাজে লাগানোর সাহসই একজন সাধারণ মানুষকে সফল উদ্যোক্তা বানিয়ে দেয়।

=================

© মো: রিয়াদ কাইসার


আরও পড়ুন:
ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে দেখুন অল্প পুঁজির ব্যবসা 

চাকরি সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে দেখুন চাকরি চাই 

শখের পেশা সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে দেখুন শখের পেশা 

ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে জানতে দেখুন ফ্রিল্যান্সিং


============================================