এক নং প্রশ্নের কারন :-
কোন এক গহীন জঙ্গলে এক হিংস্র বাঘিনী কিংবা কোন গভীর সাগরে এক শান্ত স্ত্রী তিমি একটা বাচ্চা প্রসব করল।
কিছুক্ষণ পর সেই ছোট্ট বাচ্চাটার খিদে পেল। মানুষের বাচ্চা হলেতো মা নিজের হাতে বাচ্চার মুখে স্তন ঢুকিয়ে দেয়, বাঘিনী কিংবা তিমিটা তখন কি করে? আচ্ছা ধরে নিলাম তারাও বাচ্চাকে স্তনের কাছে নিয়ে আসে, এই স্তন মুখে দিয়ে চুষতে হবে, নির্গত দুধ পান করতে হবে এই ব্যাপারটা বাচ্চাটাকে কে শিখিয়ে দিচ্ছে - এমন কি মানুষের বাচ্চাটাকেও?
- কেউ কেউ এটাকে প্রকৃতির নিয়ম বলে বিশ্বাস করে।
- অনেকে এই প্রাণ, বস্তু, প্রকৃতি, পৃথিবী, বিশ্ব, মহাবিশ্ব, বহু মহাবিশ্ব, অসীম মহাবিশ্বের সমস্ত নিয়ম, সমস্ত কিছুই এক সৃষ্টি কর্তার সৃষ্টি বলে বিশ্বাস করে।
- আর আমরা (মুসলমান) সেই সৃষ্টিকর্তাকেই এক আল্লাহ যার কোন শরীক নেই বলে বিশ্বাস করি (ঈমান আনি)।
অনেক বৃহৎ ব্যাপারে বিশ্বাস! ছোটখাটো কোন বিষয় নয় কিন্তু।
ঘুণে ধরা কাঠের দরজা কিংবা কোন আসবাবপত্র দেখেছেন কখনো?
ছোট্ট একটি ঘুণপোকা আস্ত কাঠের দরজাটিকে খেয়ে গুঁড়া গুঁড়া করে ধ্বংস করে দেয়। এর পরও আমরা তাকে দরজা বলেই ডাকি, বড়জোড় ঘুণেধরা দরজা বলি- তাই না?
আমাদের সেই বৃহৎ বিশ্বাসে যখন ছোট্ট ঘুণে ধরে তখন কি আমরা টের পাই? গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যাওয়া সেই বিশ্বাস(ঈমান) কে আমরাও ভিন্ন নামে ডাকি না।
আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ (উপাস্য, মান্য, সাহায্যপ্রত্যাশী) নাই। আর বাস্তবতা হলো আমরা আমাদের টাকা, সম্পত্তি, সন্তানাদি, ব্যবসা, চাকরি, পড়ালেখা, রুপ, গুন, নেতা, সরকার, আমেরিকা, আইএমএফ, জাতিসংঘ সহ আরও অনেক কিছুকে ইলাহ (উপাস্য, মান্য, সাহায্যপ্রত্যাশী) বানিয়ে রেখেছি জীবনে।
- হ্যাঁ, বৃদ্ধ বয়সে আমার সম্পদ, সন্তানাদি আমাকে খাওয়াবে পরাবে, ভাল রাখবে এই ধারনাটাই সম্পদ-সন্তানাদিকে ইলাহ মান্য করে।
- এই ব্যবসা, এই চাকরি করে আমি প্রতিষ্ঠিত হব- এই বিশ্বাসটাই ব্যবসা-চাকরিকে ইলাহ মান্য করে।
- পড়ালেখা করলে ভাল চাকরি হবে, ভবিষ্যৎ নিরাপদ, রুপ-গুন থাকলে ভাল বিয়ে হবে, এই ধারনাগুলোই পড়ালেখা, রুপ, গুনকে ইলাহ বানায়।
- সত্য বলা যাবে না !! সত্য বললে নেতা বকবে, পদ কেড়ে নেবে, সরকার মারবে-জেলে দেবে, আমেরিকা গার্মেন্টস অর্ডার দেবে না, আইএমএফ লোন দেবে না, জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা দেবে।
পদ কেড়ে নিলে, জেলে দিলে, গার্মেন্টস অর্ডার না দিলে, লোন না দিলে, নিষেধাজ্ঞা দিলে কি হবে?
বিপদে পড়ব, আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে, দেশ অচল হয়ে যাবে, অভাব আসবে, সব শেষে না খেয়ে মরে যাব - এমন কিছু ধারনাই আমাদের বিশ্বাসে (ঈমানে) তাদেরকে ইলাহ বানিয়ে রেখেছে।
আমরা টেরই পাইনি কখন কিভাবে এমন একেকটা ঘুণপোকা আমাদের বিশ্বাসকে গুঁড়া গুঁড়া করে করে দিয়েছে। ধবংস হয়ে যাওয়া সেই ঈমানকে (বিশ্বাস) আমরা এখনও ঈমান বলেই এবং নিজেকে ঈমানদার বলেই ডাকছি যেমন ঘুণে ধরা দরজাটিকে আমরা দরজা বলেই ডাকি, ভিন্ন নামে ডাকি না।
তাহলে কি সম্পদ, সন্তানাদি, ব্যবসা, চাকরি, পড়ালেখা কিছুই করব না?
অবশ্যই করব। এই সব করাটাও আল্লাহ’র আদেশ। এই সমস্ত কিছুই করতে হবে কেবল আল্লাহ’র সেই আদেশ পালনের শর্তে, ঠিক যেভাবে আমরা নামাজ-রোজার আদেশ পালন করি। স্রেফ ”আদেশ পালন”। তাহলেই বিশ্বাসীর ভাত খাওয়াটাও ইবাদত।
ইসলাম আসার পূর্বে ক্বাবা ঘরের ভেতরেই ৩৬০টি ইলাহ’র মূর্তি ছিল যা মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা:) নিজ হাতে ধ্বংস ও অপসারণ করেন।আজকে আমরা মনের এক প্রান্তে বিশ্বাস করছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ (উপাস্য,মান্য,সাহায্যপ্রত্যাশী) নাই পক্ষান্তরে মনের অন্য প্রান্তে এই রকম ৩৬০টির ও অধিক ইলাহকে স্থান দিয়ে রেখেছি এমনকি হালের গরুটিকেও।
আল্লাহ তাঁর সাথে কোন কিছুকে তুল্য, অংশীদার, সমকক্ষ মান্য করাকে শিরক (সব চেয়ে বড় গুনাহ- এমন কি যিনা, ব্যবিচার, হারাম খাওয়া থেকেও বড় গুনাহ) এবং সরাসরি জাহান্নামের শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেন।
ভাত কি দিয়ে খেয়েছ, কোরবানির গরু কত দিয়ে কিনেছ- দুনিয়াতে এমন হাজারো প্রশ্ন থেকেও “মান রব্বুকা” অর্থ ”তোমার রব (ইলাহ,উপাস্য,মান্য,সাহায্যপ্রত্যাশী) কে?” কবরের প্রথম প্রশ্ন হবার কারনটা কিছুটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।
মুনকার নাকিরের সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা অতোটা সহজ হবে না যতটা সহজ মনে করি। এক ইলাহ’র সাথে শরীক করে যত ইলাহকে বিশ্বাসে স্থান দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে ইহজীবন কাটিয়ে দিয়েছিলাম, সেই দিন তাদের প্রত্যেকের নাম উচ্চারিত হতে থাকবে একে একে।
হ্যাঁ, তারাই সহজে ”রব্বী আল্লাহ” উত্তর দেবে যারা ইহজীবনে এক আল্লাহ’র কাছেই এবং শেষ পর্যন্ত শুধুই এক আল্লাহ’র কাছেই আত্মসমর্পণ করে - কিছুতেই কোন লোভ, ধোঁকা, ভয়, শক্তিকে শরীক করে না।
==============
মোঃ রিয়াদ কাইসার
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
